উপোল মাণ্ডির চিঠির উত্তর মিলবে ব্রিগেডে

সেই গ্রাম থেকে ঝাড়খণ্ডের দূরত্ব মাত্র ২৫০ মিটার। সেই গ্রামের এক কিশোরীর স্বপ্ন আর সঙ্কটের চিঠি এই ফেব্রুয়ারিতে এসে পৌঁছেছে ১৭০ কিমি দূরে লালদিঘির ধারে — মহাকরণে।

গ্রামের নাম বুড়িঝোড়। থানা বেলপাহাড়ি। কাছেই কাঁকরাঝোড় আর তার ভাঙা, মাইন-বিধ্বস্ত বনবাংলো। শীত পেরিয়ে গেছে। এখন, এই ফেব্রুয়ারিতে বুড়িঝোড়ের শালমহল কিংবা মহানগরে একইসঙ্গে শিমূল পলাশের আলো ধরেছে। সন্দেহ নেই বসন্ত আসছে। আর উপোল মাণ্ডি নামে ঐ কিশোরীর মনোবাসনার মানচিত্র আঁকা দু’পাতার চিঠিও আর এক বসন্তেরই ইঙ্গিতময়।

মাওবাদী নাশকতায়, মাওবাদী-তৃণমূলের যৌথ সন্ত্রাসে জীবনযাপন, সংসার করা অসম্ভব বুঝে স্বরাজনারায়ণ মাণ্ডি সপরিবারে বেলপাহাড়ির ঐ গ্রাম ছেড়েছেন বেশ কয়েক মাস আগে। কোনোক্রমে আছেন ঝাড়গ্রাম শহরে, এক ভাড়াবাড়িতে। তাঁর মেয়ে উপোল। উপোল বেলপাহাড়ির আবাসিক রাষ্ট্রীয় উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তো। নাশকতা, সন্ত্রাসে পরিবারের সঙ্গে সেও, তার স্কুল, বন্ধু, পরিবেশ, খেলার মাঠ, চেনা বিকেল আর শাল-পলাশের গাছ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে অচেনা ঝাড়গ্রামে। কিন্তু তার প্রবল পড়াশোনার ইচ্ছা। উপোলের এই পড়াশোনার ইচ্ছার কথা সবিস্তারে জানিয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাজনারায়ণ মাণ্ডিই চিঠি পাঠিয়েছেন মহাকরণে — রাজ্যের তফসিলী জাতি আদিবাসী ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী যেগেশ বর্মণের কাছে। তাদের আরজি ঝাড়গ্রামেই একটি স্কুলে যাতে উপোল ভর্তি হতে পারে।

চিঠিতে আদিবাসী কিশোরীর তৃণমূল-মাওবাদীর নৈরাজ্যে আহত স্বপ্নের কথা আছে। আবার ঐ চিঠিতে রয়েছে এই রাজ্যের আদিবাসী, জঙ্গলখণ্ডের মানুষের পরিবর্তিত আশা আকাঙ্ক্ষার ছবি। এই পরিবর্তন বিগত ৩৪বছরের। কিন্তু উপোলের চিঠি যেদিন ঐতিহাসিক মহাকরণের তিনতলায় পৌঁছেছে, সেদিনই আবার পাহাড়ের আগুনে পুড়েছে বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যের ভবন। উপোলের চিঠিতে যখন কাঙ্ক্ষিত সুখের বর্ণাঢ্য, পাহাড়ের আগুনে তখন ধ্বংসের চেনা সব দুঃসহ দহনচিহ্ন।

উপোল মাণ্ডি জানেনা যে, দার্জিলিঙে যারা ২০০৮-র এপ্রিলে বিমল গুরুঙদের বৈঠক করেছিল গোপনে, তারাই তার সাধের, ভালোবাসার বাসভূমিতে, সেই জঙ্গলমহলে নির্বিচারে মানুষ খুনের আসামী। তাদের জন্যই উপোলের ঘর আর স্কুল ছাড়া। তারা মাওবাদী। তাদের কয়েকজনের নাম রাজা সরখেল, প্রসূন চ্যাটার্জি, শশধর মাহাতো কিংবা ছত্রধর মাহাতো। রাজা, প্রসূন আর গৌর চক্রবর্তী — এই তিনজনই দার্জিলিঙে বৈঠক করেছিল বিমল গুরুঙদের সঙ্গে। ঐ তিনজনই এখন পুলিসী হেফাজতে। আবার মাওবাদীদের পক্ষ থেকে ঐ রাজা আর প্রসূনই ২০০৭-র জানুয়ারি থেকে বারবার সমতলে, এই মহানগরের আশেপাশে বৈঠক করেছে তৃণমূলের সঙ্গে। ২০০৭-র নভেম্বরের ৬ তারিখ সেই একটি বৈঠক হয়েছিল খোদ তৃণমূলের সদর দপ্তরে, ই এম বাইপাসের ধারে। সেই বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। দার্জিলিঙের বৈঠকে আলোচনা হয়েছিল গোর্খা লিবারেশন পার্সোনেল (জি এল পি) নিয়ে। মাওবাদীদের পরামর্শেই গড়ে উঠেছিল বিমল গুরুঙদের সেই প্রাইভেট আর্মি। আর ঐ মাওবাদী আর তৃণমূল মিলেই সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়ে তৈরি করেছিল যৌথ সংগঠন — ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’ বা ‘পুলিসী সন্ত্রাস-বিরোধী জনসাধারণে কমিটি’। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার হামলা, শিবির চালানো, বেপরোয়া সরকারী সম্পত্তিতে আগুন লাগানোর কোন প্রতিবাদ তৃণমূল করেনি। আবার ঐ তৃণমূলের নেত্রীই দু’বছর আগে ফেব্রুয়ারির এক দুপুরে সটান, নিরাপত্তা রক্ষীর পরোয়া না করে চলে গেছিলেন লালগড়ের খাসজঙ্গলে — মাওবাদীদের ঘেরাটোপে জনসাধারণের কমিটির সভায়। এই সব যোগসূত্রর কথা উপোল মাণ্ডি জানে না। জানতে চায়ও না। যৌথবাহিনী স্কুল দখল করে রয়েছে বলে যারা একসময় রোজ সাংবাদিকদের সামনে প্রতিবাদ জানিয়েছে, ক্লাসরুম থেকে উপোলের ছিটকে পড়ার বিষয়ে তাদের, সেই মানবাধিকার কর্মী, মমতানির্ভর বুদ্ধিজীবী আর তৃণমূলের নেতাদের কী বক্তব্য — উপোল জানে না। সে শুধু আবার ক্লাসরুমে বসতে চায়, পড়তে চায়।

উপোলকে তার ক্লাসরুম আবার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জঙ্গলমহলে এখনো পর্যন্ত প্রাণ দিয়েছেন প্রায় ৩১ জন বামফ্রন্টের কর্মী। তাঁদের অনেকে শিক্ষক — যেমন বেলপাহাড়ির মাছকাঁদনা গ্রামের করমচাঁদ সিং। স্কুল ঘরের সামনে তাঁকে গুলি করার পর থেঁতলে মেরেছিল মাওবাদী আর তৃণমূল। তবু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেননি শিক্ষকরা। ছাত্র ফুলচাঁদ মাহাতোকে খুন করে কিষেনজী জানিয়েছিল নাবালক ফুলচাঁদ নাকি ‘প্রতিক্রীয়াশীল’। ঝাড়গ্রামের লোধাশুলির কাছে এক বিপন্ন গ্রামে আজো কলেজের উজ্জ্বল ছাত্র অভিজিতের রক্ত তাঁর মায়ের চিবুকে লোনাপানি হয়ে ঝড়ে।

অভিজিত মাহাতো আর ফুলচাঁদের লোহিত কণিকারা আরো অনেকের সঙ্গে, পায়ে পায়ে ব্রিগেডে আসবে। আগামী ১৩ তারিখ। সেদিন শহীদের স্বপ্নবাহীদের থেকে উপোলকে তার ক্লাসরুমের রৌদ্রছায়া ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব ঘোষণা করবে জনসমুদ্র — সেই বহুযুদ্ধের ব্রিগেডে।

উপোল মাণ্ডি, আর একটু অপেক্ষা করো।

 

Powered by Drupal, an open source content management system