উন্নয়নের স্বার্থে গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করুন

কাল বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিগেডে ঠিক ৩৭০দিন বাদে পুনরায় বামফ্রন্টের সমাবেশ হচ্ছে। বিগত এক বছরে রাজ্যের রাজনীতিতে গরিবের ঐক্য ধ্বংস করার প্রতিক্রিয়ার কর্মসূচী যেমন অব্যাহত রয়েছে ঠিক তেমনই গরিবের ঐক্য গড়ে তোলার সংগ্রাম অতীতের তুলনায় অনেক বেশি প্রসারিত হয়েছে। গণতন্ত্র সুরক্ষিত করার আন্দোলনও আগের থেকে অনেক জোরদার হয়েছে। এ’রাজ্যে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস শেষ কথা বলবে না— এই বার্তা রাজ্যের সর্বত্র সক্রিয় রয়েছে এবং এই বার্তার পক্ষে সাধারণ মানুষও আগের তুলনায় বেশি বেশি করে সাড়া দিচ্ছেন। রাজ্যের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কষ্ট থেকে মুক্তির জন্যও প্রতিবাদে সোচ্চার রয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রের কংগ্রেস-তৃণমূল জোট সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থে জিনিসপত্রের দর কমানোর কোনো চেষ্টা করছে না। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী-আমলারা দুর্নীতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন।

বিরোধীদের পক্ষ থেকে তারস্বরে প্রচার চলেছে, ৩৪বছর বামফ্রন্ট সরকার কিছুই করেনি, রাজ্যে কোনো উন্নয়ন হয়নি। এই প্রচার সত্য না মিথ্যা, তা সাধারণ মানুষকে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতায় একটু পরখ করে নিতে হবে। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কেন ৩০লক্ষাধিক কৃষক প্রায় সাড়ে ১১লক্ষ জমি বিনামূল্যে পেয়েছেন? কিভাবে ৩৭শতাংশ তফসিলী জাতিভুক্ত, ১৮শতাংশ আদিবাসী এবং ১৮শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষ পাট্টা পেয়ে জমির মালিক হয়েছেন? কী করে এ’রাজ্যের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে শতকরা ৮৪ভাগ জমি এসেছে? এই রাজ্যে কেন সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৫লক্ষ ১৩হাজারের বেশি বর্গাদারের আইনী অধিকার সুরক্ষিত? কারণ খুবই সহজ। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার গ্রামের গরিব মানুষের স্বার্থে জোতদার, জমিদার, মহাজনদের হাত থেকে সাধারণ কৃষক সমাজকে রক্ষা করতে ভূমিসংস্কার কর্মসূচীকে কার্যকরীভাবে রূপায়িত করেছে। ৪৫লক্ষের উপর গরিব কৃষক ও খেতমজুরের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা এবং তাঁদেরকে বিনামূল্যে জমি ও চাষের অধিকার দেওয়া কি উন্নয়ন নয়? কৃষকের এই উন্নয়নের ধারায় পুষ্ট হয়েছে এই রাজ্যের কৃষি কাজ। ফলে বর্তমানে রাজ্যে ১৭০লক্ষ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং এই রাজ্য খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত রাজ্য হয়েছে। অথচ ১৯৭৭সালের আগে এই রাজ্যই ছিলো খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য এবং তখন খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিলো মাত্র ৭৪লক্ষ মেট্রিক টন। এটা উন্নয়ন নয় এমনটা কম লেখাপড়া জানা মানুষও বলবেন না।

শুরু থেকে বামফ্রন্ট সরকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তর ছিলো না, সে ধরনের শিল্পও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সেই দপ্তর তৈরি হওয়ার পর ধীরে ধীরে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে রাজ্যে ১৪২৬টি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ৩৩০৫কোটি ১৩লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ১লক্ষ ১৭হাজারের বেশি মানুষের। বামফ্রন্ট সরকার শহরের গরিব মানুষের বসবাসের জমির নিশ্চয়তাও দিচ্ছে। উদ্বাস্তুরা পাচ্ছেন জমির দলিল। বিশ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারী অব্যবহৃত খাস জমিতে বসবাসকারী শহরের গরিব মানুষ মাত্র ১টাকায় ৯৯বছরের দীর্ঘমেয়াদী লিজ পাচ্ছেন। সংস্কার হয়েছে ঠিকা প্রজাস্বত্ব আইন।

রাজ্যে শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিরোধীদের চক্রান্ত অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও শিল্পে বিনিয়োগ ঊর্ধ্বমুখী। শুধুমাত্র ২০০৯সালেই এ’রাজ্যে ৮হাজার ৪০০কোটি টাকার কিছু বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। রাজ্যে বেশ কয়েকটি ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠছে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে। এই মুহূর্তে এই শিল্পে লক্ষাধিক ছেলেমেয়ে কাজে যুক্ত রয়েছেন। ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে রাজ্যের অবস্থান সারা ভারতে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে রাজ্যে ক্ষুদ্রশিল্পের ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ২৮লক্ষ। কর্মসংস্থান প্রায় ৫৫লক্ষ। আরো উন্নতি করতে হবে। কিন্তু যা উন্নতি হয়েছে তা কিছুই নয়, একথা কি বলা যায়!

শিক্ষাক্ষেত্রেও উন্নয়ন অব্যাহত। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে শিক্ষার সুযোগ সব মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। হয়েছে জুনিয়র স্কুল, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে শিশু শিক্ষা কেন্দ্র (এস এস কে), এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র (এম এস কে), যা পরিচালিত হয় পঞ্চায়েত দপ্তরের মাধ্যমে। শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা যুক্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটছে। এ’বছর রেকর্ড সংখ্যক ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে। সংখ্যার বিচারে প্রায় ১০লক্ষ। ’৭৭সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ২লক্ষ। কেউ বলতে পারেন, আরে লোকসংখ্যা বাড়ছে বলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু লোক সংখ্যা যেখানে ১.৬গুণ বেড়েছে সেখানে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫গুণ। কেউ কি বলবেন এটা উন্নয়ন নয়! কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বেড়েছে ব্যাপক হারে। আসলে গরিব, নিঃস্ব, নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা বেশিবেশি করে শিক্ষার অঙ্গনে যুক্ত হচ্ছে। এরজন্য সবার আনন্দ করা উচিত। কোনো কটুবাক্যের প্রশ্নই নেই। রাজ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে এবং পাঠক্রম, পাঠ্যসূচীর পরিবর্তন ঘটিয়ে তার মানোন্নয়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ধারাবাহিকভাবে বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে রাজ্যে গড় আয়ু বেড়েছে, জন্মহ্রাস হয়েছে, মৃত্যুহার কমেছে। প্রসূতি মৃত্যুর হার হ্রাসে এ’রাজ্য জাতীয় হারের তুলনায় অনেক উন্নত অবস্থা রয়েছে। উল্লেখ্য, শতকরা ৭৩ভাগ মানুষ স্বাস্থ্য পরিষেবা নেন সরকারী হাসপাতাল থেকে। এটা অবশ্যই রাজ্যের মানুষের স্বার্থে উন্নয়ন। রাজ্যের সংগঠিত শিল্প শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় বামফ্রন্ট সরকার সক্রিয় এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থে শ্রমিক সংগঠনগুলির যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যকে সমর্থন করে। এ’রাজ্যে খেতমজুর ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং স্বাস্থ্যরক্ষায় সুরক্ষা প্রকল্পসহ নতুন কিছু সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পও রূপায়িত হচ্ছে। রাজ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে স্বনির্ভরগোষ্ঠীর কাজ। যার সংখ্যা এখন ১২লক্ষ। এর সদস্যসংখ্যা ১কোটি ২০লক্ষের মতো। ব্যাঙ্ক থেকে ৪শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে এই গোষ্ঠীগুলি যাতে কাজ করতে পারে সে’বিষয়ে সরকার সহায়তা করে। এইসব কাজ দেখভাল করার জন্য সরকার একটি নতুন দপ্তর তৈরি করেছে, যা অতীতে ছিলো না।

এ’রাজ্য জাতীয় সংহতি, ঐক্য ও সম্প্রীতির আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির জগতে এই রাজ্যের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ২০০৯সালে লোকসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের শান্তি, শৃঙ্খলা ধ্বংস করতে বিধানসভার প্রধান বিরোধীদল যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করছে তাতে গণতন্ত্র আক্রান্ত। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের যে কর্মসূচী নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কোথাও নিজেরা, কোথাও তৃণমূল-মাওবাদী জল্লাদ বাহিনী, কোথাও বা কংগ্রেস এককভাবে বা কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেস যৌথভাবে যেসব অকাজ করে চলেছে, তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। গত লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে আজ পর্যন্ত জঙ্গলমহল এলাকায় ২৬০জন-সহ ৩৭৭জন বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নেতা, কর্মীকে এই জল্লাদবাহিনী খুন করেছে। এরমধ্যে নিঃস্ব, গরিব আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ১৫৯জন। তৃণমূল কংগ্রেস ও মাওবাদী জল্লাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজ্যব্যাপী প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করে জেলায় জেলায় জনগণের মাঝে প্রচার পর্ব শেষ করে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা পা বাড়াবেন ব্রিগেডের সমাবেশে। এই মহাসমাবেশ থেকে বাংলার সব অংশের মানুষ উন্নয়নের স্বার্থে গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করার দাবিতে সোচ্চার হবেন। তাঁরা অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়ে তোলার লক্ষ্যে আরো বেশি করে গরিব মানুষের ঐক্যের ভিতকে মজবুত করার শপথ নেবেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সমাবেশে নিজেদের যুক্ত করে, আত্মবিশ্বাসে ভর করে, অর্জিত অধিকার রক্ষায় সঙ্ঘবদ্ধ হবেন। ব্রিগেড প্রমাণ করবে, ইতিহাস রচনা করেন মানুষই।

Powered by Drupal, an open source content management system