এক অন্য লুট : এবার নায়ক মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানি
লুটেরারা নিজেরাও স্তম্ভিত সাম্প্রতিক লুটের বহর দেখে! শুধু শ্রীমান রাজার টেলিকমের বড় খেলায় দেশের লোকসান (সি এ জি’র হিসাবে) প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। একশো টাকার নোট গুনতে আরম্ভ করলে কয়েক বৎসর কেটে যাবে। তার পরেও বস্তা বস্তা টাকা পড়ে থাকবে। ফুরোবে না। হ্যাঁ, লুট হ্যায়তো এইসা! অবশ্য রাজ্যের বিরোধী নেত্রী এসব দেখতে পান না। তিনি ‘সততার প্রতীক’ যে। তাঁর এসব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আমলাদের লুঠপাট দেখলে চলে? সময় নষ্ট হবে না?
দেশের শতকরা ৭৭ জন মানুষের দৈনিক খরচ করবার ক্ষমতা ২০ টাকার নিচে (ডাঃ অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটির রিপোর্ট)। এককিলো চাল কেনার পর নুন কিনতে গালে হাত। বাকি সব ভোঁভা। রাজার যদি সাজা হয় সুরেশ কালমাদি কম কিসে? উলঙ্গ রাজারা সব চলেছেন মিছিলে সঙ্গে সাথী বিশ্বস্ত আমলা বাহিনী। অলিন্দে নিশ্চুপ প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। শুধু দেখছেন। ওনার এসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? আর্থিক সংস্কার, বাজারী অর্থনীতির রথ ঠিক চলছে কিনা তা দেখতে তিনি বড় ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর সময় কোথায় দেখার রাজা রানী আমলারা, তাঁর সহকর্মীরা কি করছেন? জানলেও নির্বিকার তিনি। নিশ্চুপ।
এই শতাব্দীর, নাকি সর্বদেশের সর্বকালের, রেকর্ড বর্তমান এই কেলেঙ্কারির গুচ্ছ? কংগ্রেস-তৃণমূল-ডি এম কে জোট সরকারের দুর্নীতির বন্যা দেশকে, দেশের সম্পদকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কালো টাকার পাহাড়। সব দেশকে টেক্কা দিয়ে ভারতীয়রা প্রায় ৭০ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশী ব্যাঙ্কে, অন্যত্র জমা করেছে (একটি হিসাবে ১৫০০ বিলিয়ন ডলার)। গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনগিট্রিটি নামে সংস্থার অন্য সমীক্ষা বলছে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকা জমা আছে শুধু সুইস ব্যাঙ্কে, কিছু অন্যত্র জমিয়ে ফেলেছে ভারতীয়েরা। এদের নাম কিন্তু কিছুতে প্রকাশ করা যাবে না। নানা আইনী অজুহাতে তাদের আড়াল করতে ব্যস্ত ড. মনমোহন সিং-এর সরকার আর তাঁর অর্থমন্ত্রী।
টেলিকম, কমনওয়েলথ গেমস, মুম্বাই-এর আদর্শ কো-অপারেটিভ (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক চ্যবন-সহ অন্যান্য অনেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা যেখানে অভিযুক্ত), দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সিভিসি প্রধান পদে নিয়োগ, নীরা রাডিয়ার টেপে প্রকাশিত বিস্ফোরক সব তথ্য, আই পি এল (অভিযুক্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শশী থারুর বিদায় নিয়েছেন); তালিকা দীর্ঘতর হয়েই চলেছে ইউ পি এ-২ সরকারের মন্ত্রীদের আমলাদের মিছিল দুর্নীতির দায়ে যারা অভিযুক্ত। এখনও অনেককে আড়াল করে রাখার চেষ্টায় ত্রুটি নেই ড. মনমোহন সিং সরকারের। এর পাশে তুলনায় ৩৪ বছরের পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট রাজত্বের চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগের আঙুল তুলতে পারেননি বিরোধীরা।
কংগ্রেস-তৃণমূল-ডি এম কে রাজত্বে এই মহালুটের পাশাপাশি চলেছে অন্য এক লুট। দারিদ্র্য দূরীকরণের অজুহাতে ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা সংস্থাগুলির (এম এফ আই) গরিবকে লুটের মহাকাব্য। অন্ধ্র প্রদেশে গরিব মানুষকে ব্যাপক লুটের কথা প্রকাশ্যে আসার পর অন্ধ্র প্রদেশের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া সবাই নড়ে চড়ে বসেছে। ওয়াই এইচ মালিগাঁওকে সভাপতি করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (আর বি আই) যে কমিটি নিয়োগ করেছিল তার রিপোর্ট পেশ হয়েছে সম্প্রতি। রিপোর্টে বলা হয়েছে — এম এফ আই-এর পক্ষে (১) শতকরা ২৪ টাকার বেশি সুদ নেওয়া যাবে না (২) ২৫ হাজার টাকার বেশি কোনো গরিব মানুষকে ঋণ দিতে পারবে না। (৩) দুই জায়গার বেশি ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা (এম এফ আই) সংস্থা থেকে ঋণ দেওয়া যাবে না। এইসব।
গোড়া কেটে আগায় জল দিয়েছে কমিটি। আসলে এম এফ আইদের লুটের উৎস কি? গঙ্গার উৎস গঙ্গোত্রী, এই অন্য লুটের উৎস হ’ল নয়া উদারবাদী অর্থনীতি, বাজারী অর্থনীতি। সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাঙ্ক পরিষেবার বিস্তৃতির পরিবর্তে গরিবকে গরিবী থেকে মুক্তি আর বাজারী অর্থনীতি যার মূল কথা মুনাফা, আরও মুনাফা — এই দুই বিপরীত মেরুকে আর্থিক সংস্থার চিন্তায় আচ্ছন্ন প্রধানমন্ত্রী নাকি মেলাবেন — ‘‘ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ি’’-কে তিনি মেলাবেন।
ব্যাঙ্ক তার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। গরিবকে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ব্যাঙ্ক পরিষেবা, অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলিকে ঋণ (প্রাইয়রিটি সেক্টর লেন্ডিং)-এর দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে এই এম এফ আই বা ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা সংস্থাগুলির হাতে। ব্যাঙের ছাতার মতো নয়া উদারবাদী নীতির বর্ষায় ফুলে ফেঁপে উঠছে তারা। ব্যাঙ্কের এই পরিষেবা মডেলের নাম ব্যাঙ্কিং ক্রসপনডেন্ট বা কোথাও ব্যাঙ্কিং ফেসিলিটেটর ব্যাঙ্কের কাজ এই ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবার সংস্থাগুলিকে ঋণ দেওয়া। ব্যস ফিনান্সিয়াল ইনক্লুসান বা আর্থিক পরিষেবায় অন্তর্ভুক্তি হয়ে গেল। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ‘‘আম আদমি’’-র যখন নাভিশ্বাস আকাশছোঁয়া ‘মাঙাই’-এর চাপে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু সকলের জন্য উন্নয়ন, [‘‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’’ বা সবাইকে নিয়ে বিকাশ] — এই মন্ত্রটা সময়ে অসময়ে আওড়াতে ভোলেন না। আর অর্থমন্ত্রী বলেই চলেছেন এই সবার জন্য উন্নয়ন এর চাবিকাঠি সবার জন্য আর্থিক পরিষেবা বা ফিনান্সিয়াল ইনক্লুসান। আর পাশাপাশি ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা (এম এফ আই) সংস্থার রমরমা।
কৃষিপ্রধান দেশ ভারতে অসহায় কৃষকের মতো আত্মহত্যার পথে যেতে বাধ্য হয় প্রলোভনের ফাঁদে পড়া চড়া সুদের জাঁতাকলে বন্দী দরিদ্র স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থারা অসহায় নারীদের আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়ার ভূরি ভূরি নজির আছে জনসমক্ষে। যেমন ঘটেছে ব্যাপকভাবে কংগ্রেসী নেতৃত্বাধীন অন্ধ্র প্রদেশে এবং অন্যত্রও। এই অন্য লুট, গরিবকে গরিবী থেকে মুক্তির বাণী শুনিয়ে গরিবকে মহাজনী লুট এও প্রধানমন্ত্রীর অতি পছন্দ নয়া উদারনীতিরই এক খেলা।
এখন নয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একটু নড়ে চড়ে বসেছে। একটা কমিটি হয়েছে। তারা একটা রিপোর্টও দিয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যার গভীরে যায়নি এই কমিটি। ভারতে ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবার সংস্থার সংখ্যা কম করে ১৪৯। মোট আর্থিক লেনদেন কমপক্ষে ২৫০০০ কোটি টাকা। প্রায় পৌনে তিন কোটি মানুষ-এর সঙ্গে যুক্ত সদস্যা গ্রহীতার গোষ্ঠীর তালিকায়।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশে এক অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনুস ‘গ্রামীণ ব্যাঙ্ক’ নামে গরিব মানুষকে ক্ষুদ্র ঋণ ও আর্থিক পরিষেবা দিয়ে স্বনির্ভর করার এক আন্দোলন গড়ে তোলেন। দুনিয়াজুড়ে একটা হইচই পড়ে যায়। মহম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পান (শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার)। সাম্প্রতিককালে উপরোক্ত নোবেল বিজয়ী সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়। যাইহোক, তা আজকের আলোচনার অন্তর্গত বিষয় নয়। আজকের বিষয় — দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে দরিদ্রকে লুটের এক মহাকাব্য যার নাম মাইক্রো ফিনান্স ইনস্টিটিউশন (এম এফ আই)। এরা দরিদ্র, প্রধানত দরিদ্র মহিলাদের ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে। উদ্দেশ্য, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে এই নারী সমাজের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।
২০০১ সালের জনগণনায় দেখা যায় আমাদের দেশে স্বাধীনতার এতো দশক পরেও ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পায় খুব বেশি হলে শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ। পরবর্তী সময়ে নানা জনমুখী প্রকল্পের সুবাদে এই হার হয়েছে খুব বেশি হলে শতকরা ৪৫। তাও গড় হিসাবে। গ্রামের চিত্রটি খুবই করুণ। দরিদ্র কৃষক, গ্রামীণ শিল্পী কারিগর (আর্টিজান) ইত্যাদি প্রধানত সুদখোর মহাজনদের ওপর নির্ভর করে অল্প ঋণের জন্য। পরিণতি ঋণের জাল। আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে গরিব কৃষক ও গ্রামীণ গরিব। ২০০৫ সালে বামপন্থীরা যখন কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক ছিল এই দরিদ্র মানুষকে কিভাবে সুদখোর মহাজনদের শোষণ থেকে মুক্ত করা যায় তার রাস্তা বাতলাতে প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি গঠন করেন যার প্রধান ছিলেন সি রঙ্গরাজন, বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। গরিবের জন্য ব্যাঙ্ক পরিষেবার জন্য অনেক সুপারিশ নিয়ে রিপোর্ট পেশ হয় ২০০৮ সালে। ইতোমধ্যে নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নয়া উদারনীতির কল্যাণে বেসরকারী ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান (এম এফ আই)গুলি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। এদের ৭টি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ৫০টি এম এফ আই-র মধ্যে পড়ে। আবার একটির তো আবার ভারতের শেয়ার বাজারে ঢুকে রমরমা।
দেশে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ব্যাঙ্ক পরিষেবার সুযোগের করুণ যে চিত্র বারে বারে প্রকাশিত তার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে অধিকাংশ মানুষকে আর্থিক পরিষেবায় অন্তর্ভুক্তির (ফিনান্সিয়াল ইনক্লুসান) লক্ষ্য সাধনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হ’ত যদি যেখানে ব্যাঙ্কের শাখা নেই সেখানে নতুন শাখা, আমানতহীন পাসবই-এর সুযোগ, চলমান ব্যাঙ্ক পরিষেবা, আর আর বি, সমবায়ের মাধ্যমে আর্থিক পরিষেবা ইত্যাদির পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে ডাকঘরগুলিকেও (দেশের প্রায় ১,৫৫,০৩৫টি পোস্ট অফিসের ১,৩৯,১৭১ গ্রামাঞ্চলে) এই লক্ষ্যে ব্যবহার করা যেত। তার পরিবর্তে এসেছে বেসরকারী ডাকসেবা, হয়েছে সরকারী ডাকসেবা ক্রমসঙ্কোচন আর এ থেকেই হ’ল নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতির লক্ষ্য। ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের প্রধান জায়গা যে ডাকঘর বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংস্থান করে থাকে, আর্থিক পরিষেবার বিপুল দায়ভার বহন করার পরেও ব্যাঙ্কের কাজকর্মের অনুমতি বা অধিকার তাদের দেওয়া হয়নি। পরিকল্পনা কমিশন নিয়োজিত একটি কমিটিও দরিদ্র মানুষের স্বার্থে ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে ডাকঘরের বর্তমান পরিকাঠামো ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল। কিছু অগ্রগতি হয়নি। ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা সংস্থা ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসাবে জাঁকিয়ে বসে লুট চালিয়েছে।
উদারীকরণের, বিশেষ করে ব্যাঙ্ক, বীমা প্রভৃতি আর্থিক ক্ষেত্রে উদারীকরণের পরবর্তী সময়ে একদিকে ব্যাঙ্কগুলি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি ইত্যাদি ক্ষেত্রে (প্রাইয়রিটি সেক্টর লেন্ডিং) ঋণদান থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। গ্রামীণ পরিকাঠামো বন্ড ইত্যাদির সুযোগ দিয়ে সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার রাস্তা করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই। আর ব্যাঙ্কগুলি, বিশেষত উদারীকরণের পর বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে সরাসরি ঋণ দেওয়া অপেক্ষা মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবা সংস্থার (এম এফ আই) মাধ্যমে ঋণ দেওয়াই নিরাপদ ও পছন্দসই হিসাবে বেছে নিয়েছে। একটি বার্ষিক সমীক্ষায় দেখা যায় সারা দেশে ব্যাঙ্কগুলি যদি স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ১৪,৪৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে থাকে তো ক্ষুদ্র আর্থিক সংস্থা (এম এফ আই)-কে দিয়েছে ১০,৭০০ কোটি টাকা। স্বাভাবিকভাবেই এম এফ আই-দের রমরমা বেড়েছে। বেড়েছে লুটের বহরও। রাঘব বোয়ালেরা নেমে পড়েছে।
অন্ধ্র প্রদেশে ভারতের মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানির প্রায় ৭৫ ভাগই কাজ করে থাকে এবং সেখানে দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে শোষণ বঞ্চনার ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়ে যাবার পর সম্প্রতি রাজ্য সরকার, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া অনেকেই নড়ে চড়ে বসে। অন্ধ্র প্রদেশ বিধানসভায় এ বিষয়ে একটি আইনও পাস হয়েছে। তাতে চিত্রটা বিশেষ পালটেছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া নিয়োজিত মালেগাঁও কমিটির রিপোর্টেও এই লুট থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখিয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই। ভারতবর্ষে আজ শতকরা মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষের কাছে ব্যাঙ্কের পরিষেবা পৌঁছায়। স্বাধীনতার ছয় দশক সময়ের পরেও ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের ৪১ বৎসর পরেও এই দেশের অধিকাংশ মানুষের এই ব্যাঙ্ক পরিষেবার ক্ষেত্রে একই বঞ্চনার চিত্র। পরিবর্তনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে একদিকে ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে শাখাবিহীন ব্যাঙ্কিং প্রদান করা, ব্যাঙ্ক সাথী মাধ্যমে দোরগোড়ায় ব্যাঙ্কিং, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য সরলীকৃত পদ্ধতি ইত্যাদি বহু কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গরিবের জন্য ব্যাঙ্ক পরিষেবার গালভরা অনেক প্রতিশ্রুতি ঢাক ঢোল পিটিয়ে ড. মনমোহন সিং, প্রণববাবুরা প্রচার করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গরিব মানুষ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন। গ্রামীণ সুদখোর মহাজন গ্রামীণ গরিবকে ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। এখন সুদের জালে আবদ্ধ গ্রামীণ গরিব সর্বস্বান্ত হচ্ছে এম এফ আই বা গরিব হিতৈষী ক্ষুদ্র আর্থিক পরিষেবার সংস্থাগুলির হাতে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্স কোম্পানি (এন বি এফ সি) নামে প্রতিষ্ঠানদের ব্যাঙ্ক পরিষেবা, আমানত গ্রহণ, ঋণদান প্রভৃতির অনুমতি দিয়েছে। দেয়নি আমানতের বীমা গ্যারান্টি, বেঁধে দেয়নি সুদের হার, গরিবী দূরীকরণের লক্ষ্যে লাভহীন (নো প্রফিট) সংস্থার জায়গায় লাভ যুক্ত (ফর প্রফিট-র) রাঘব বোয়ালেরা মাঠে নেমে পড়েছে, দেশী-বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অনেকে এই কাজে নেমে পড়েছে; সারা দেশে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য এন বি এফ সি ব্যাঙ্ক নয় এমন ঋণদান সংস্থা ; আমানত গ্রহণ ও ঋণ দানকারী কোম্পানি। রাঘব বোয়াল নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এই লুটে যুক্ত। গরিবের আমানতের টাকা উধাও হয়, তাও যদি না হয় কোথায় বিনিয়োগ হবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কোনো নির্দেশিকা তাদের জন্য থাকবে না। সুদের হারও সর্বনাশা। শতকরা ৩০, ৪০, ৫০, ৬০, ৭০ বা তারও বেশি। শেয়ার বাজারে খাটানো হচ্ছে গরিবের জমানো টাকা। কালো টাকার আর এক চক্র তৈরি হয়েছে। বিদেশী প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড (পি ই ফান্ড)ও এসে নামে বেনামে নেমে পড়েছে বাজারে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাথে জনহিতৈষী, গরিবহিতৈষী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী যে কয়েকটি সংগঠন আছে তাদের কাজকে ছোট করে দেখানো কখনোই উচিত নয়। এই লেখার উদ্দেশ্যও মোটেই তা নয়।
কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা কি নগর পালিকা ব্যবস্থা কি সমবায়কে উপেক্ষা করে নয়া উদারবাদী আর্থসামাজিক দর্শনের আধিপত্য কি ভয়ানক রূপ নিতে পারে বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এন জি ও নামে তা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে জানেন।
এন জি ও-কে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা আমাদের দেশের শাসক শ্রেণীর মধ্যে প্রবলভাবে চেপে বসেছে। এই সুবাদে বহু বিদেশী শক্তি আমাদের দেশের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোকে দুর্বল করে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করে চলেছে। তার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে।
এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে। প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ গরিব মানুষ ১৪ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে একত্রিত। স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও ব্যাঙ্কের সরাসরি যোগাযোগে রাজ্য সরকার, পঞ্চায়েত, পৌরসভা, সমবায় মিলিতভাবে সৃষ্টি করছে ক্ষমতায়নের এক নতুন ইতিহাস।
আসলে সেবার দর্শনের হাত ধরে পুঁজিবাদ নিজেকে সঙ্কট থেকে বাঁচবার নিত্যনতুন পথ খুঁজে চলেছে। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ আজকের দুনিয়ার ‘‘ফিলানথ্রপিক-ক্যাপিটলিজম’’ বা জনসেবা মোড়কের পুঁজিবাদ। এ এক নতুন সোনার পাথরবাটি।
মাইক্রোসফ্টের মালিক বিল গেটস বর্তমানে পৃথিবীর ২ নম্বর ধনী ব্যক্তি। তিনি তাঁর সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছেন একটি সেবা প্রতিষ্ঠানকে। — যার নাম বিল-মিলান্ডা (তাঁর স্ত্রীর নাম) ফাউন্ডেশন। দুনিয়ার গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য নাকি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহৃত হবে। খুব ভালো কথা। ওয়ারেন ব্যাফে আরেকজন ধনী, পৃথিবীর মধ্যে ৩ নম্বর ধনী। এঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন ফেশ বুক-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর অর্ধেক সম্পত্তি দান করে দিয়েছেন পৃথিবীর দরিদ্রের সেবায়। ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর ধনীদের কাছে প্রথমোক্ত দু’জন আবেদন জানিয়েছেন দরিদ্রের সেবায় ধনীদের সম্পদের অর্ধেক দান করে দিতে। কিন্তু যে কথা জিজ্ঞাসা করা বারণ তা’হলো — ‘‘কি করে এতো সম্পদ তৈরি হলো?’’
মানব সেবা পরম ধর্ম। দরিদ্র মানুষ নারায়ণ, ঈশ্বর। ভারতীয় দর্শনের এই সব চোখা চোখা কথা হতদরিদ্র ভারতবাসী জানে। সে শুধু জানে না কত ভারতীয়ের কি পরিমাণ কালো টাকা বিদেশী ব্যাঙ্কে, কর ফাঁকির দেশে গচ্ছিত আছে। কেন্দ্রীয় সরকার তা জানাতে চায় না নানা আইনী অজুহাত দেখিয়ে। আমাদের দেশে প্রতি মিনিটে সহস্র সহস্র হিসাব বহির্ভূত টাকা কালো হয়ে বিদেশে যায়, সাদা বিনিয়োগ হয়ে মরিশাস, দুবাই, হংকং, সিঙ্গাপুরের হাত হয়ে ঘরে ফেরে। মুকেশ আম্বানির মতো সেরা ভারতীয় ধনীর প্রাসাদের বৈভব তাজমহলের আকর্ষণকেও বোধ হয় হার মানাতে চলেছে।
তারই ফাঁকে বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবীরা এসে দাঁড়িয়েছে — জনসেবার যেন জীবন্ত প্রতীক। (মাইক্রো ফিনান্স ইনস্টিটিউসন বা এম এফ আই) বা ক্ষুদ্র ঋণদান শতকরা ৩০, ৪০ নয় দেশের কোথাও কোথাও ১০০ টাকায় ৭০ টাকা কি তার বেশি সুদ নেওয়া হয় গরিব ঋণগ্রহীতা মানবীর কাছ থেকে তাকে ক্ষমতায়ন, স্বনির্ভরতার আলেয়ায় প্রথমে আকর্ষণ করে। পরে আলেয়া আলেয়াই থেকে যায়। মানবীর পরিণতি হয় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যায়। সে যে ঋণের জালে বন্দী। আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। কিন্তু জনসেবকের অবস্থা?
আমেদাবাদের একটি নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষক এই জনসেবকদের উলঙ্গ করে দিয়েছেন। ঐ সমীক্ষা বলছে, একটি মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানি-র প্রধান বছরে যে বেতন নিয়েছেন তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এমন কি বেসরকারী ব্যাঙ্কের প্রধান যা পায় তার থেকেও বহুগুণ বেশি। গরিবের সেবার কি মাহাত্ম্য! ঐ এম এফ আই-এর প্রধানের আত্মীয় অন্য একটি অনুরূপ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। পান একই রূপ। বীভৎস পরিমাণ বেতন যা লজ্জা দেবে সেবার ধারণাকেও। আর এই লুটেরা সংস্থাদের বৃদ্ধির হার প্রায় ৬০ শতাংশ সংখ্যাগত ভাগে। আর হতভাগ্য দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে? সাম্প্রতিক ম্যাকিনসে রিপোর্ট বলছে যে গত তিন বছরে দেশে গরিবী বেড়েছে, গরিবের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে ধনীদের সম্পদ বেড়েছে, কমেনি।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, সোনিয়া গান্ধী, প্রণব মুখার্জিরা উন্নয়ন, বিকাশের জি ডি পি (প্রায়)-এর ঢাক বাজিয়ে চলেছেন - মাঝে মাঝে মনে হয় ‘আম আদমির’জন্য প্রধানমন্ত্রী যেন নিদ্রা বিসর্জন দিয়েই বসে আছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শুধু জানেন না ভয়াবহ মাঙাই বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দানবের হাত থেকে এই হতদরিদ্র কোটি কোটি মানুষকে কেমন করে রক্ষা করা যায়। কংগ্রেস দল, ভুলেই গেছে ২০০৯ নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘খাদ্য নিরাপত্তার’ প্রতিশ্রুতির কথা।
প্রধানমন্ত্রীকে মাইক্রো ফিনান্স ইনস্টিটিউশনগুলির গরিব মানুষকে নির্মম শোষণের কথা জানানো হয়েছিল। আকাশ ছোঁয়া সুদের হারের কথা জানানো হয়েছিল তাঁকে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে উত্তরে একবার বললেন — ‘‘সুদখোর মহাজনেরা তো এর থেকেও বেশি নেয়। তার থেকে তো এরা ভালো।’’ হায় ভারতবর্ষ! তোমার প্রধানমন্ত্রী একজন দুনিয়া জোড়া খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ সাহেব, ওবামারাও তাঁর জ্ঞান গরিমার প্রশংসায় মুখর। সেই প্রধানমন্ত্রীর এই হতভাগ্য দেশ সম্পর্কে ভাবনার তারিফ না করে পারা যায় না।
এরই মাঝে সব মানুষের জন্য ব্যাঙ্ক পরিষেবার কাহিনী শোনাবে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ। প্রণববাবুর ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপন জ্বলজ্বল করবে — সাম্প্রতিক ‘‘স্বাভিমান’’ — নামের ব্যাঙ্কবিহীন এলাকার ব্যাঙ্কিং পরিষেবার সোনালি প্রতিশ্রুতি। প্রধানমন্ত্রীর আমজনতা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকবে — ‘আহা কি আনন্দ!’ এরই মাঝে অন্য লুট চলবে। সীমাহীন, বাধাহীন।

Recent comments
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago