জলের প্যাকেটও নিতে দেয়নি পুলিস
হাওড়া, ১৪ই আগস্ট— পিচ রাস্তার উপরই বসেছিলেন বৃদ্ধা। শুধু এক বৃদ্ধাই কেন? গোটা এক গ্রাম এদিন সকাল থেকে রাস্তায়। আশ্রয়হীন পরিবারগুলি এসেছেন জাগলদহ থেকে। উদয়নারায়ণপুরের সিংটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এই গ্রাম এখন জলের তলায়। বসতবাড়ি, চাষের জমির দখল এখন ঘূর্ণিজলের। দামোদরের পশ্চিমপাড় ভেঙে শিবানীপুর, আকনাপুরে জোকার ওপর দিয়ে চাষের জমি, বাড়িঘর ভাসানো জল ঘিরে ফেলে জাগলদহকে। তাই জাগলদহ এদিন সকাল থেকেই পিচরাস্তায়।
চারিদিক জলের মাঝে অসীমা দলুই ও বিভা দলুইকে নিয়ে রাস্তায় বসেছিলেন ৭০বছরের বৃদ্ধা শঙ্করী দলুই। ‘‘বন্যার জলে ঘর ভেসেছে। কী খাবো জানি না। সকাল থেকে রাস্তায় বসে আছি। ত্রাণের দেখা নেই।’’ বলছিলেন বৃদ্ধা শঙ্করী দলুই। বাধ্য হয়ে ত্রাণের খোঁজে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বৃদ্ধা।
শঙ্করী দোলুইয়ের এক ছেলে মোহিত দোলুই বললেন, ‘‘জয়নগর মোড়ে প্যাকেটের জল আছে। বৃদ্ধা মায়ের জন্য আনতে গিয়েছিলাম। পুলিস নিতে দিলো না। শঙ্করী দোলুই বললেন, ‘‘জল চেয়েও পেলাম না। সি পি আই (এম)র লোকজনকেও তৃণমূল মারধর করছে। তারাও সাহায্য করতে পারছে না। তৃণমূল নেতারা ব্যস্ত নিজেদের লোকদের সরকারী সাহায্য দিতে। কবে যে অত্যাচার বন্ধ হবে জানি না।’’ চরম দুর্দশার ছবি উদয়নারায়ণপুরের ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেই। সকাল ১০-৩০ মিনিটে বিধিচন্দ্রপুরের পিচরাস্তা দিয়ে এগোনেই গেল না। হু হু করে জল বাড়ছে। বাস চলাচলও বন্ধ হওয়া উদয়নারায়ণপুর যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত। দু’একটি ট্রেকার যাও চলছে জল ঠেলে তাও বাদুড়ঝোলা ভিড়েঠাসা। বিধিচন্দ্রপুরের রঘুনাথপুর উত্তরপাড়ায় দেখা গেল একবুক জল ভেঙে শঙ্কর কাঁড়ার শেষ সম্বল বেগুনচারা বাঁচাতে ব্যস্ত। প্রসেনজিৎ চোঙদার, গৌর মান্নাদের অভিযোগ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ওঁদের অভিযোগ, ‘‘নামেই বলা হচ্ছে স্পিডবোট আনা হয়েছে। ত্রাণের খাবার এসেছে। গরিব মানুষ কিছু সুবিধাই পায় না।’’ উদয়নারায়ণপুর থানা কিংবা বাস স্ট্যান্ডে যাওয়া যে দুঃস্বপ্ন তা বোঝা গেল কুমারচকে কিংবা রাজাপুরে গিয়ে। কুমারচকে বি ডি ও অফিসের গাড়ি নিয়ে তৃণমূল বিধায়ক সমীর পাঁজা এলেন। তিনি জানালেন, ‘‘ত্রাণ দিতে যাচ্ছি।’’ ত্রাণ বলতে কিছু জলের প্যাকেট কিংবা বিস্কুটের কিছু প্যাকেট। কিন্তু বন্যার্ত মানুষের তুলনায় তা এতটাই অপ্রতুল বোঝা গেল মল্লিকপাড়ায় গিয়ে। ছেলেকে কাঁধে নিয়ে স্থলভাগের খোঁজে চলেছেন বাবা। বাড়িতে রয়েছে স্ত্রী ও পরিবারের অন্যরা। মল্লিকপাড়ার আনোয়ারা মল্লিক জানালেন, ‘‘তিনদিন ধরে জলবন্দী হয়ে আছি। কোনো সরকারী ত্রাণ মেলেনি। মিনিট পাঁচেক পরেই নৌকো করে রওনা দিলেন তৃণমূলী বিধায়ক। কারণটা বোঝা গেল একটু পরেই। ত্রাণের আর্তি নিয়ে সংখ্যালঘু অনেক পরিবার বেরিয়েছে কিন্তু ত্রাণের পরিমাণ এত নগণ্য ত্রাণ শেষ হয়েছে আগেই। জলবন্দী মানুষ ত্রাণের আশায় চিৎকার করছেন। কিন্তু সেই চিৎকার পৌঁছেও পৌঁছোচ্ছে না বিধায়কের কানে। এমন দৃশ্য উদয়নারায়ণপুর ব্লকের ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেই। রাজাপুর পিচ রাস্তা যেন নদীর চর। জল বয়ে যাচ্ছে পিচ রাস্তা দিয়ে। মাঠ, একতলা ঘর, ধান খেত ডুবেছে। দোতলা পাকাবাড়িতে সাধারণ মানুষ ও গবাদি পশু একসাথে রয়েছে । একতলা ঘরের খাট সারি সারি ইট দিয়ে সিলিং পর্যন্ত উঁচু করে রাখা। তাতে কোনোক্রমে রয়েছেন সাহেবা বেগমরা, গৃহকর্তা শেখ আব্দুল রেজ্জাক জানালেন, ‘‘খাবার জল পাচ্ছি না।’’ সর্বত্রই ত্রাণের জন্য কালো কালো ফ্যাকাসে মুখগুলো তাকিয়ে রয়েছে বানের জলের দিকে ঐ বুঝি রিলিফের গাড়ি আসে। কিন্তু, রিলিফের দেখা নেই। তবে উলুবেড়িয়ার মহকুমাশাসক দেবকুমার নন্দন জানিয়েছেন, ‘‘উদয়নারায়ণপুরের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। চিড়ে, গুড়, বেবিফুড, চাল, জল পর্যাপ্ত দেওয়া হচ্ছে ত্রাণ শিবিরগুলোতে।’’ আমতা ২নং ব্লকের ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় রাতের পর সম্পূর্ণ বন্যা কবলিত হবে বলে প্রশাসনের আশঙ্কা। ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ‘‘রামপুর খালে জল বাড়ছে। উদয়নারায়ণপুর সীমান্তবর্তী থলিয়ার শেওয়াবেড়িয়া পিচ রাস্তা দিয়ে জল প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে থলিয়া, বিকেবাটি, অমরাগাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে সম্পূর্ণ বন্যা কবলিত হওয়ার আশঙ্কা।’’ সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ইতোমধ্যে জিবিচিৎনান, কাশমূলী, ভাটোরার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

Recent comments
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago