এ সি’তেও মন ভরেনি, রান্নার বাসনও চান মন্ত্রীরা
কলকাতা, ১৫ই আগস্ট — রাজ্যের তৃণমূলী জোট সরকারের কোনও কোনও মন্ত্রী তাঁদের জন্য বরাদ্দ সরকারী ফ্ল্যাটে রান্নাঘরের জন্য দরকারী বাসনকোসনও কিনে দিতে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন! তাঁদের বায়নার বহর দেখে বিস্মিত রাজ্যের পূর্ত সচিব বাধ্য হয়ে পূর্তমন্ত্রী সুব্রত বক্সীকে চিঠি দিয়েছেন। তাতে তাঁর স্পষ্ট আরজি, মন্ত্রীদের ফ্ল্যাটের জন্য সরকারী পয়সায় যা তাঁদের পাওনা, তার বেশি যদি কিছু দিতে হয়, তারজন্য সরকারী স্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরী। এই চিঠিতে পূর্ত সচিব এ আর বর্ধন নাম না করে বামফ্রন্ট সরকারের আমলের কথা উল্লেখ করে পূর্তমন্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আগে রাজ্যের মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাটে শুধু দুটো তোষক, চেয়ারসহ একটি ডাইনিং টেবিল, একটি সোফা সেট ও জানালার পর্দা দেওয়া হতো। অন্য যা কিছু সরকার হতো, তা প্রয়োজন মনে করলে মন্ত্রীরা নিজেরাই কিনে নিতেন।’’
কিন্তু এখন পরিবর্তনের জমানা। মা-মাটি-মানুষের সরকার। কিন্তু নামেই। এমনকি রাজ্যে নাকি প্রবল আর্থিক সঙ্কট, ভাঁড়ারে নাকি কোনও পয়সা নেই, এমন কথাও প্রচার করছে নতুন তৃণমূলী জোট সরকার। অথচ মন্ত্রীদের চাহিদা সামলাতে পূর্ত দপ্তরের আমলাদের ঘাম ছুটে যাওয়ার উপক্রম!
পূর্ত সচিব তাঁর ওই চিঠিতে গত ১৪ই জুলাই পূর্তমন্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছেন, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যা-ই থাকুক না কেন, নতুন সরকারের আমলে রাজ্যের মন্ত্রীদের ফ্ল্যাটে কী কী বরাদ্দ করার ব্যবস্থা হয়েছে। এই তালিকাটি হলো, দুটো তোষক, ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার, একটা সোফা সেট, চেয়ারসহ একটা পড়ার টেবিল, একটি ওয়ারড্রোব, এয়ার কন্ডিশনারসহ সমস্ত ধরনের আলো ও পাখা, জানালার পর্দা এবং একটি ২৬ ইঞ্চি রঙিন এল সি ডি টিভি।
তালিকায় প্রমাণ, তৃণমূলী জোট সরকারের আমলে মন্ত্রীদের ফ্ল্যাট সাজাতে সরকারী ব্যবস্থাপনায় আরো বেশি আয়োজনের ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু পূর্ত সচিবের চিঠিটি প্রমাণ করছে, এতেও হচ্ছে না কোনও কোনও মন্ত্রীর। পূর্তমন্ত্রীকে ওই চিঠিতে সচিব লিখেছেন, আমরা নতুন মন্ত্রীদের অনেকের কাছ থেকে এরপরেও ঘর সাজানোর উপকরণ হিসাবে বেশকিছু জিনিস সরবরাহ করার আরজি পাচ্ছি। তাতে রান্নাঘরের আসবাবপত্র ও বাসনকোসন দেওয়ার আরজিও রয়েছে। কিন্তু এসব বাড়তি জিনিস কিংবা যে জিনিস যত সংখ্যায় প্রাপ্য তার চেয়ে বেশি দেওয়ার যে আরজি, তা পূরণ করার দায়িত্ব নিজের উপর নেননি পূর্ত সচিব। ফলে পূর্তমন্ত্রীকেই চিঠি দিয়ে তিনি বলেছেন, যদি এই আরজি পূরণ করতে হয়, তাহলে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে হবে না।
এই পূর্ত সচিবই গত ১১ই জুলাই রাজ্যের পূর্তমন্ত্রীকে আরো একটি চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, মহাকরণে রাজ্যের নতুন মন্ত্রীদের ঘর সাজানো ও মেরামতির জন্য খরচের যা বহর, তাতে এখনই জরুরীভিত্তিতে অন্তত ২ কোটি ১২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। রাজ্য বাজেটের যে বরাদ্দ হবে, তার বাইরে ‘নন প্ল্যান’ যাতে ‘স্পেশাল কেস’ হিসাবে ওই টাকা বরাদ্দ করার জন্য তিনি রাজ্যের অর্থমন্ত্রককে অবগত করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন ওই চিঠিতে। চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘এই টাকা বরাদ্দ না করলে রাজ্যের মন্ত্রীদের মহাকরণে অফিসঘর সংস্কারের যে কাজ, তা আটকে যেতে পারে।’
এদিকে পূর্ত দপ্তরের ফাইলে একটি হিসাব থেকেই জানা গিয়েছে, মহাকরণে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির চাহিদা অনুযায়ী তাঁর অফিসঘরের শুধু বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনার কাজ সারতেই পূর্ত দপ্তর (ইলেকট্রিক্যাল)-এর খরচ হয়েছে ১৩ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা! এই হিসাবটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, ক্ষমতায় আসার পর মহাকরণে তাঁর নিজের অফিসঘরটি তাঁর পছন্দের করে সাজানোর উদ্যোগ শুরু হতেই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ২ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন পূর্ত দপ্তরকে। তখন প্রচার করা হয়েছিল, সরকারী টাকায় না, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিজের দেওয়া টাকাতেই নিজের অফিসঘরের সংস্কার করাচ্ছেন। কিন্তু এখন পূর্ত দপ্তর হিসাব করে দেখছে, অন্য কাজ নয়, শুধু বিদ্যুতের কাজ করাতেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের জন্য খরচ হয়ে গিয়েছে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা! হিসাব এইরকম, মুখ্যমন্ত্রীর চেম্বারের ইলেকট্রিক্যাল কাজে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাসোসিয়েট অফিসের ইলেকট্রিক্যাল কাজে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা, মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের এসি-র জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা, মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে কম্পিউটার সরঞ্জাম বসাতে ৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, মুখ্যমন্ত্রীর অফিসের ডিজিটাল টেলিফোন ব্যবস্থার জন্য ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। শুধু এই কাজেই এমনভাবে ১৩ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে অন্যান্য খরচ ধরলে পূর্ত দপ্তরের হিসাবে টাকার পরিমাণ এতটাই যে, মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ২ লক্ষ টাকা নেহাতই বিন্দু। অথচ প্রচার চলেছে, রাজ্যের টাকার অভাব, তাই মুখ্যমন্ত্রী নিজের দেওয়া ২ লক্ষ টাকায় অফিস সাজিয়েছেন।

Recent comments
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago