বন‌্যায় মৃতের সংখ‌্যা বেড়ে ২৩ ত্রাণের জন্য বাড়ছে হাহাকার

কলকাতা, ১৫ই আগস্ট— বন্যায় ক্রমশই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। এদিনও এক শিশুসহ আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দু’জনকে বাদ দিয়েই সরকারী হিসাব অনুযায়ী বন্যায় রাজ্যে মৃতের সংখ্যা ২১ছুঁয়েছে। তারই মধ্যে বাড়ছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। এমনকি সরকারী ত্রাণে শিশু খাদ্যও মিলছে না। হাওড়া, হুগলী, উত্তর ২৪পরগনা, দক্ষিণ ২৪পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরসহ দক্ষিণবঙ্গে বন্যাদুর্গত বিভিন্ন জেলার এমনই চিত্র। অথচ রাজ্যের তৃণমূল জোট সরকার এবং এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তাতে কোনো হেলদোল নেই। এমনকি বন্যা দুর্গত মানুষ যখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন, তখন ‘ত্রাণ পেতে হলে ধৈর্য ধরতে হবে’, এমন মন্তব্য করতেও রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা পার্থ চ্যাটার্জির একটুকুও বাধেনি। হুগলীর খানাকুলের বালিপুর গ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষ পার্থ চ্যাটার্জিকে সামনে পেয়ে তাঁর কাছে যখন ত্রাণের জন্য মিনতি করছিলেন তখন তাঁদের প্রয়োজনীয় ত্রাণ দেওয়ার জন্য সরকারী অফিসারদের নির্দেশ দেওয়ার বদলে এমনই মন্তব্য করেছেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী।

হুগলী জেলায় জেলা পরিষদের কাছে আগে থেকে যেটুকু ত্রাণ সামগ্রী ছিল তা দুর্গত মানুষের কাছে বিলি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই সামান্য। কিন্তু রাজ্য সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন হুগলী জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রদীপ সাহা। তিনি বলেছেন, হুগলীর ২৫টি গ্রাম পঞ্চায়েত সম্পূর্ণ বন্যার কবলে। আংশিক বন্যা কবলিত আরো ৭৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত। বন্যা দুর্গত মানুষের সংখ্যা সাড়ে চার লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এই অবস্থায় এই জেলায় ত্রাণের জন্য অবিলম্বে আরো ৪৫০টন চাল, ১০হাজার ত্রিপল, পর্যাপ্ত শিশুখাদ্য এবং খয়রাতি সাহায্য হিসাবে ১০লক্ষ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু বার বার আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সেই ত্রাণ সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, যেটুকু ত্রাণ মিলছে তা নিয়ে তৃণমূলের দুর্নীতি ও দলবাজিতে বন্যাদুর্গত মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন যে, উত্তর ২৪পরগনার স্বরূপনগরে এবং বীরভূমের শীতলগ্রাম এলাকায় তাঁরা তৃণমূলের দুই নেতার ওপর চড়াও হয়ে তাঁদের মারধর করেছেন। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের মধ্যে তৃণমূলের সমর্থকরাও ছিলেন। বীরভূম জেলার লাভপুরে বন্যা পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভের মধ্যে পড়েন। ত্রাণ না পেয়ে উত্তর ২৪পরগনার স্বরূপনগরের বাংলানি গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের পঞ্চায়েত প্রধান আবিদ গাজিকে সাধারণ গ্রামবাসীরা চড়-থাপ্পড় মারেন। বীরভূমের শীতলগ্রামের ত্রাণ না পাওয়া মানুষের হাতে তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্য এমন মার খেয়েছে যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের কুরচি শিবপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া আড়াই হাজারের বেশি মানুষ গত ৫দিনে ত্রাণ হিসাবে পেয়েছেন মাত্র ৫বস্তা চিঁড়ে। সরকারী ত্রাণে এক কৌটোও শিশুখাদ্য না মেলায় বন্যাদুর্গত পরিবারের শিশুরা চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছে। যেটুকু ত্রাণ ব্লকে আসছে, তা এলাকার তৃণমূলের লোকজন লুঠপাট করে নিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ। হরালি উদয়নারায়ণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতেরও একই অবস্থা। সুলতানপুরের জমিনদারি বাঁধে ফাটল ধরায় গজাগ্রাম এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। উদয়নারায়ণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে স্টেট জেনারেল হাসপাতাল পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাঁধ সারানোর কোনো ব্যবস্থাই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়নি। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আমতা ২নং ব্লকের থলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত। এই এলাকার অনেক জায়গায় মানুষ গাছের ওপরে ত্রিপল খাটিয়ে বন্যার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করছেন। তাঁদের উদ্ধার করার জন্য সরকারীভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বি কে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং আমরাগড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাও নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে আংশিক প্লাবিত হয়েছে ঝামটিয়া, ঝিখিরা গ্রাম পঞ্চায়েত। সেখানকার মানুষের মধ্যেও রয়েছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। ডি ভি সি আরো জল ছাড়ায় হাওড়া এবং হুগলীর আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিন মালদহের কালিয়াচক দু’নম্বর ব্লকের যুগলটোলা শিবপুর গ্রামের ২৫বছরের যুবক প্রতুল মণ্ডল ফুঁসে ওঠা গঙ্গার পাড়ে থাকাকালীন হঠাৎ করে পাড় ভেঙে যায়। ভেসে যান ঐ যুবক। বেশ কিছুক্ষণ বাদে এলাকার মানুষ নদী থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করেন। এদিন জমির পাট কাটার সময় প্রতুল নদীর ধারে যান। তখনই ফুলে ফেঁপে ওঠা নদীর পাড় ধসে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এদিনই হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের বিধিচন্দ্রপুর-ভবানীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ভবানীপুর গ্রামে জলে ভেসে গিয়ে দেবব্রত প্রামাণিক নামে চার বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই দুই মৃত্যুর ঘটনা বাদ দিয়েই সরকারী হিসাবে রাজ্যে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২১ছুঁয়েছে। এদিন মহাকরণ সূত্রে রাজ্যে বন্যায় ২১জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এদিন বেলা ১২টা নাগাদ রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মহাকরণে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যসচিব সমর ঘোষ, স্বরাষ্ট্র সচিব জ্ঞানদত্ত গৌতম এবং সেচ সচিব অঞ্জন চ্যাটার্জি উপস্থিত ছিলেন। দামোদর, রূপনারায়ণ, জলঙ্গী, মুণ্ডেশ্বরীসহ রাজ্যের ৬টি নদীর জল বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে বলেও মহাকরণ সূত্রে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ডি ভি সি ৭৪হাজার কিউসেক এবং কংসাবতী বাঁধ থেকে ২০হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। বন্যার জলে মালদহ এবং দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হলেও রাজ্যের মাত্র তিনটি এলাকা হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর, আমতা এবং হুগলীর খানাকুলকে বন্যাকবলিত বলে ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। সরকারী ত্রাণ না মেলায় জেলায় জেলায় বন্যা দুর্গত মানুষের মধ্যে হাহাকার বেড়ে চললেও বন্যা কবলিত জেলাগুলিতে পর্যাপ্ত ত্রাণ পাঠানোর বিষয়ে এদিন মহাকরণের বৈঠকের পরেও রাজ্য সরকারের তরফে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি।
 

Powered by Drupal, an open source content management system