আন্নাকে গ্রেপ্তার করে সঙ্কটে কেন্দ্র
নয়াদিল্লি, ১৬ই আগস্ট — সকালে গ্রেপ্তার, দিনভর দেশজুড়ে বিক্ষোভ, বুধবার আরো বড় বিক্ষোভের আশঙ্কা। আন্না হাজারে ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের আটক করাকে কেন্দ্র করে এই প্রতিক্রিয়ার মুখে অনেক রাতে আন্নাকে তিহার জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে দিল্লি পুলিস জানিয়েছে। আবার, আন্নার শিবিরের সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হচ্ছে, ছেড়ে দিলেও বেরোবেন না তিনি। সরকার যতক্ষণ প্রতিবাদের ওপর থেকে শর্ত প্রত্যাহার করে ততক্ষণ তিনি বন্দীই থাকবেন। উভয়সঙ্কটে কেন্দ্র।
এ এক অদ্ভুত পরিহাসও বটে! আন্না হাজারে আর সুরেশ কালমাদিকে তিহার জেলে রাখা হয়েছে পাশাপাশি সেলে। একজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে দেশে চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছেন। অন্যজন কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। এখানেই শেষ নয়। ঐ জেলেই আন্না হাজারের সহযোগী অরবিন্দ কেজরিওয়াল আবার রয়েছেন টেলিকম কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রী এ রাজার প্রতিবেশী হিসাবে। এখবর দেন তিহার জেলের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আর এন শর্মা। পরে ঐ জেলেরই ডিরেক্টর জেনারেল নীরজ কুমার একথা অস্বীকার করে জানান যে, একজনের থেকে অপরজনকে রাখা হয়েছে অনেক দূরে। তাঁরা যাই দাবি করুন না কেন, এটা স্পষ্ট , প্রশাসন সম্ভবত দুর্নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখতে আগ্রহী নয়। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতিবাদী কন্ঠরোধ করতে সরকার যতটা তৎপর, তত সক্রিয়তা দেখা যায় না দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারি প্রতিরোধে।
একারণেই মঙ্গলবার আন্না হাজারেকে ঘিরে চললো দিনভর নাটক। এদিন সকালেই প্রস্তাবিত অনশনে বসার প্রায় ঘণ্টা তিনেক আগে সাড়ে সাতটা নাগাদ আন্না হাজারেকে দিল্লি পুলিস আটক করে পূর্ব দিল্লির ময়ূর বিহারের একটি ফ্ল্যাট থেকে। অনশনে বসলে শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে, এই যুক্তি দেখিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিসের তরফে বলা হয়, আন্না হাজারে আইন ভেঙে জয়প্রকাশ নারায়ণ পার্কে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে শক্তিশালী লোকপাল বিলের দাবিতে এদিন থেকেই অনশনে বসার ব্যাপারে নাছোড় ছিলেন। এত লোক আইন ভাঙলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, এই যুক্তি দেখিয়ে প্রথমে তাঁকে আটক এবং পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সাত দিনের জন্য বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
জেলে পাঠানো নিয়েও একপ্রস্থ নাটক ঘটে গেছে এদিন। আটক করে প্রথমে তাঁদের উত্তর দিল্লিতে দিল্লি পুলিসের অফিসার্স মেসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর বিপুল পরিমাণ সমর্থক জড়ো হয়ে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে থাকলে আন্না এবং তাঁর সহযোগীদের পশ্চিম দিল্লির রাজৌরি গার্ডেন থানায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আটকের পর আন্না হাজারে বহু অনুরোধ সত্ত্বেও জলস্পর্শ পর্যন্ত করেননি। এরপর তাঁকে মুচলেকার বিনিময়ে জামিনে মুক্তি দিতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তাঁকে বলা হয়েছিল যে, তিনি কোনোভাবেই পুলিস আরোপিত ১৪৪ধারা লঙ্ঘন করতে পারবেন না। অর্থাৎ, জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের তিনি যেন অনশন শুরু করতে পারবেন না সহকর্মীদের নিয়ে। অথচ তিনি ফের অনশনে বসার প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসতে চাননি। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তিনি ঐ শর্ত মানতে রাজি হননি বলেই তাঁর ৭দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজত হয়। পরে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তিহার জেলে। তাঁর সঙ্গেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল, শান্তিভূষণ, কিরণ বেদী এবং মণিশ সিসোদিয়াকে পাঠানো হয় জেলে। তবে সন্ধ্যার দিকে শান্তিভূষণ এবং কিরণ বেদীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, আন্নার সহযোগীরা সরকারেই ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণের প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। আন্না হাজারেসহ তাঁর সহযোগীরা এদিন দাবি করেন, এদিন থেকে শুরু হলো দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই। আন্না হাজারে তাঁর সমর্থকদের ‘জেল ভরো’ কর্মসূচীতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। কিরণ বেদী অভিযোগ করেন, দেশে ফের সেই জরুরী অবস্থা ফিরে এলো।
লোকপাল বিল মনঃপুত হয়নি আন্না হাজারে এবং তাঁর সমর্থকদের। সেই প্রতিবাদেই এদিন থেকে সমর্থকদের নিয়ে অনশনে বসার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে দিল্লি পুলিস সোমবারই ঐ প্রস্তাবিত অনশন আটকাতে জয়প্রকাশ নারায়ণ পার্ক এবং তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ধারা জারি করে। আন্না হাজারে এবং তাঁর সহযোগীরা অবশ্য অনশনে বসার ব্যাপারে অনড় থাকেন। বাধা দিলে তাঁরা জেল ভরো কর্মসূচীতে শামিল হওয়ার ডাক দেন। এই অনশন আটকাতে দিল্লিজুড়ে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলা হয়। এদিন সকালেও ময়ূর বিহার, রাজঘাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিস মোতায়েন করা হয়। জড়ো করা হয় বিপুল পরিমাণ বাস, ট্রাক। পাশাপাশি শক্তিশালী লোকপাল বিলের দাবিতেও জড়ো হন প্রচুর মানুষ। আন্নার মতো গোটা দিল্লিতে এদিন গ্রেপ্তার হন ১৪০০-রও বেশি তাঁর সমর্থক। বিশেষ করে তাঁর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন প্রতিবাদে।
শুধু দিল্লি নয়, আন্নার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে গোটা দেশ। মুম্বাইয়ে নবি মুম্বাই এবং মাতুঙ্গায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন যথাক্রমে ৫০ ও ২০জন। মানুষ প্রতিবাদে শামিল হন আন্না হাজারের নিজের শহর মহারাষ্ট্রের রেলিগা সিদ্ধিও। পুনেতেও প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন মানুষ। বেঙ্গালুরুতে ফ্রিডম পার্ক এলাকায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ স্বাক্ষর কর্মসূচীতে শামিল হন। বিশেষত তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা বেশি মাত্রায় শামিল হন এই স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেস-র কর্মীরা এদিন প্রতিবাদে দুপুরের খাবার খায়নি। চেন্নাইয়ে আন্না হাজারের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেছেন গান্ধীজীর এক সময়ের ব্যক্তিগত সচিব কল্যাণম। তাঁর সঙ্গে শামিল বহু মানুষ। আসামের গুয়াহাটিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধরনায় বসেন মানুষ। একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা যায় পাঞ্জাব, রাজস্থান, হরিয়ানা, জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশে। এমনকি আন্না হাজারের সমর্থকরা বুধবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইন্ডিয়া গেট থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত মিছিল করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এদিন সাংবাদিকদের একথা জানান প্রশান্তভূষণ। এই ‘অহিংস’ প্রতিবাদ তাঁরা গোটা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান বলে জানান তিনি।
এদিকে, আন্না হাজারের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এদিন সোচ্চার ছিল সংসদ। সভার কাজ মুলতবি হয়ে যায় চিৎকার-চেঁচামেচিতে। পরে সাংবাদিকদের কাছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী পবন বনশল অভিযোগ করেন যে, বিরোধীরা সরকারকে কোনো কথা বলতেই দিচ্ছে না। সংসদীয় ব্যবস্থায় এটা সঠিক নয়। সরকার জবাব দিতে গেলেই তাঁরা চিৎকার করছেন। তবে মুখার্জি বা বনশল যাই বলুন না কেন, এদিন সকালে আন্নার গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বি জে পি নেতা এল কে আদবানি অভিযোগ করেছিলেন যে, সরকার প্রতিবাদী কন্ঠরোধ করতেই অনেক বেশি তৎপর দুর্নীতি প্রতিরোধের চেয়ে।

Recent comments
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago