তৃণমূল জোট সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে মিছিলে-সভায় প্রতিবাদে সোচ্চার রাজ্য

কলকাতা, ১৯শে আগস্ট— রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে মনোভাব নিয়ে সি পি আই (এম) নেতা সুশান্ত ঘোষের বিরুদ্ধে মামলা সাজাচ্ছে রাজ্যের তৃণমূল জোট সরকার, তা বরদাস্ত করতে রাজি নন এ’রাজ্যের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ। তাই রাজ্য সরকারের এই মনোভাব এবং সাজানো মামলায় সুশান্ত ঘোষকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শুক্রবার উত্তাল হলো গোটা রাজ্য। পথে নেমে ধিক্কার মিছিল ও প্রতিবাদ সভার মধ্য দিয়েই এদিন রাজ্যের তৃণমূল জোট সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং সুশান্ত ঘোষের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হলেন হাজার হাজার মানুষ।

রাজ্যের তৃণমূল জোট সরকারের নির্দেশ ও মদতে যার অভিযোগের ভিত্তিতে সুশান্ত ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই শ‌্যামল আচার্য একজন ফেরার আসামী। সে কেশপুর এলাকায় তৃণমূলের নেতা হিসাবেই পরিচিত। তার বিরুদ্ধে মাওবাদী নাশকতা এবং অস্ত্র মজুত রাখার অভিযোগও রয়েছে। মাত্র দেড় বছর আগে তার বাড়ি থেকে বিশাল পরিমাণ অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। বন্দুক হাতে ‘যোদ্ধা’র পোশাকে তার ছবি সি আই ডি-র হেফাজতেই রয়েছে। এই দাগী দুষ্কৃতী শ্যামল আচার্যকে গ্রেপ্তার না করে যেভাবে তার অভিযোগের ভিত্তিতে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে সুশান্ত ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই মেটাতে চাইছে এই রাজ্যের তৃণমূল জোট সরকার। এর বিরুদ্ধেই এদিন গ্রাম-শহরের মানুষ পথে নেমে আওয়াজ তুললেন।

হাওড়ার আমতা থানায় ২৪ঘন্টা আগে চিঠি দিয়ে প্রতিবাদ সভার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তাও এদিন বিকেলে আমতা সি টি সি বাসস্ট্যান্ডে সুশান্ত ঘোষের গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রতিবাদে সি পি আই (এম)’র ডাকা সভা বানচাল করার চেষ্টা চালায় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সরকারের পুলিস। সভার শুরুতেই পুলিস এসে বলে, মাইক লাগিয়ে সভা করা যাবে না। রাজ্যের তৃণমূল জোটের সরকার যে তার পুলিস-প্রশাসনকে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করছে, তাও এদিন আমতা থানার পুলিসের আচরণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিস-প্রশাসনের এই স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়েই এরপর খালি গলায় ওই প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম) নেতৃবৃন্দ। হাওড়ার অন্যান্য এলাকাতেও এদিন অসংখ্য ধিক্কার সভা হয়। বঙ্গবাসী মোড়ে এরকমই এক সভায় বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম) নেতা স্বদেশ চক্রবর্তী।

সাজানো মামলায় সুশান্ত ঘোষকে গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রতিবাদে এদিন বর্ধমানের গ্রাম শহরে পথে নেমেছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই এদিন বর্ধমান শহর, দুর্গাপুর, আসানসোলে কয়েক হাজার মানুষের প্রতিবাদ মিছিল হয়। বড় মিছিল হয় কালনা, কাটোয়া, মেমারি, মন্তেশ্বর, গুসকরা, গলসী, পানাগড়, রায়না, খন্ডঘোষ সহ বর্ধমান জেলার অন্যান্য এলাকাতেও।

সুশান্ত ঘোষ যে জেলার বিধায়ক, সেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাও এদিন ধিক্কার সভা এবং প্রতিবাদ মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে। যেভাবে এই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস জোট লাগামহীন সন্ত্রাস নামিয়ে আনছে, জেলার আরো অনেক সি পি আই (এম) নেতাকে জড়িয়ে দিচ্ছে মিথ্যা মামলায়, তার বিরুদ্ধেও এইসব মিছিল ও সভাগুলি থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এদিন বিকেলে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে সহস্রাধিক মানুষের এক প্রতিবাদ মিছিল হয় মেদিনীপুর শহরে। সি পি আই (এম)’র জেলা সম্পাদক দীপক সরকার সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দও এই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। কলেজ মাঠ থেকে মিছিল শুরু হয়ে গোটা শহর ঘোরার পর ফের কলেজ মাঠেই এই মিছিল শেষ হয়। জামবনী, সবং, ডেবরা, খড়গপুর, ঘাটাল, দাসপুর সহ জেলার অন্যান্য এলাকাতেও এদিন ধিক্কার মিছিল ও সভা হয়।

শ্রমজীবী জনগণ থেকে ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতী, সব অংশের মানুষই এদিন কলকাতা মহানগরের নানা প্রান্তে পথে নেমেছিলেন। সুশান্ত ঘোষকে যেখানে আটকে রেখে মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে মমতা ব্যানার্জির সরকারের পুলিস, সেই ভবানী ভবনের সামনে জমায়েত হয়ে এদিন তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন কয়েক’শ মানুষ। বিকেলে বেলতলা মোটর ভেহিকেলস থেকে সি আই টি ইউ’র ডাকে এক প্রতিবাদ মিছিলে পা মেলান কয়েক’শ শ্রমজীবী মানুষ। এদিন সন্ধ্যায় বেলেঘাটা সি আই টি রোডের জোড়ামন্দির এলাকায় এক প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রবীন দেব সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও বউবাজার ব্যাঙ্ক অব্‌ ইন্ডিয়া মোড়ে, গার্ডেনরিচ, বেহালা, টালিগঞ্জ, নেতাজীনগর, ঢাকুরিয়া, লেক গার্ডেন্স মোড়, বাঘাযতীন মোড় সহ বিভিন্ন স্থানে ধিক্কার সভা হয়েছে। প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে গার্ডেনরিচের পাহারপুর রোড, বেহালার ঠাকুরপুকুর, জেমস লঙ সরণি, সোদপুর, শোভাবাজার, রাজবল্লভপাড়া, বেলেঘাটা, মানিকতলা, কাশীপুর-বেলগাছিয়া, মধ্য পশ্চিম কলকাতা, মধ্য পূর্ব কলকাতা, উত্তর পশ্চিম কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে।

শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের সর্বত্রও এদিন ধিক্কার সভা ও প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। এদিন বিকেলে শিলিগুড়িতে সি পি আই (এম)’র ডাকে অনিল বিশ্বাস ভবনের সামনে থেকে এক বিরাট মিছিল হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে অনিল বিশ্বাস ভবনের সামনে শেষ হয়। সেখানে এক প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম)’র রাজ্য কমিটির সদস্য জীবেশ সরকার, প্রবীণ পার্টিনেতা অজিত সরকার প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। এদিন নকশালবাড়ি, বাগডোগরা, ডাবগ্রাম, নিউ জলপাইগুড়ি প্রভৃতি এলাকাতেও মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হয়। শহর সংলগ্ন এন জে পি গেটবাজার থেকেও একটি বড় মিছিল শক্তিগড়ে পৌঁছয়। কদমতলা সহ জলপাইগুড়ি জেলায় পার্টির ১৪টি জোনাল কমিটির এলাকাতেই ধিক্কার সভা ও মিছিল হয়। শহরের পাণ্ডাপাড়াতেও ধিক্কার সভা হয়। ডুয়ার্সের বানারহাট, মালবাজারের ওদলাবাড়ি চৌরাস্তার মোড়, মেটেলি, আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম, বারোভিসা, খোয়ারডাঙা, কামাক্ষাগুড়ি, ভাটিবাড়ি, যশোডাঙা ও মাঝেরডাবরিতেও মিছিল ও সভা হয়। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ, ইসলামপুর, হেমতাবাদ, ডালখোলা, চোপড়া, করণদিঘি, কালিয়াগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও পথসভা হয়েছে। ইসলামপুরের প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সুবীর বিশ্বাস সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। দক্ষিণ দিনাজপুরের ৮টি ব্লকেই সি পি আই (এম)’র ডাকে মিছিল হয়। বিকেলে পার্টির বালুরঘাট জোনাল দপ্তর থেকে একটি বড় প্রতিবাদ মিছিল শহরের বিভিন্ন পথ ঘোরে। মিছিল হয় গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর, কুশমণ্ডি, হরিরামপুর, হিলি, কুমারগঞ্জ, তপন প্রভৃতি অঞ্চলেও। কোচবিহারে সি পি আই (এম) কোচবিহার শহর লোকাল কমিটির উদ্যোগে পার্টির জেলা দপ্তরের সামনে থেকে একটি বিশাল মিছিল বের হয়ে শহর পরিক্রমা করে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ তারিণী রায় সহ অনান্য নেতৃবৃন্দ। এদিন জেলার অন্যত্রও প্রতিবাদ মিছিল হয়।

তৃণমূল জোট সরকারের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেলে নদীয়া জেলার করিমপুর, চাপড়ার পদ্মমালা, বড় আন্দুলিয়া, দৈয়ের বাজার, তেহট্ট, কালীগঞ্জ, নাকাশীপাড়া, নবদ্বীপ, শান্তিপুর, রানাঘাট, রানাঘাট পুর্ব, চাকদহ, শিমুরালী, হরিণঘাটা, কৃষ্ণগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকাতেও প্রতিবাদ মিছিল ও সভা হয়। বিশাল মিছিল হয় বীরভূমের দুবরাজপুরে। তৃণমূলের হুমকি উপেক্ষা করেই মিছিল হয় নানুরের কীর্ণাহারে। বোলপুর, সিউড়ি, সাঁইথিয়াতেও এদিন পথে নেমে মানুষ প্রতিবাদে শামিল হন। হুগলীর উত্তরপাড়া, জাঙ্গীপাড়া, চণ্ডীতলা, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, বলাগড়, শেওড়াফুলি, তারকেশ্বর, পাণ্ডুয়া প্রভৃতি এলাকাতেও অসংখ্য মিছিল এবং সভা হয়েছে। জাঙ্গীপাড়ার কোতলপুরে তৃণমূলের সন্ত্রাস উপেক্ষা করেই এমনই এক বড় মিছিলে অংশ নেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সুনীল সরকার।

উত্তর ২৪ পরগনার বিধাননগর, মধ্যমগ্রাম, পানিহাটি, বারাসত, বারাকপুর শিল্পাঞ্চল, কাঁচরাপাড়া, হালিশহর, নৈহাটি, বনগাঁ, উত্তর দমদম প্রভৃতি এলাকাতেও মিছিল ও সভা হয়। বাঁকুড়ায় এদিন যেমন মিছিল এবং সভা হয়েছে, তেমনই শনিবারও বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয় মালদহ সহ অন্যান্য জেলাতেও।

Powered by Drupal, an open source content management system