ছাত্রদের বিক্ষোভে পুলিসের আক্রমণ
শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গ্রেপ্তার কয়েকশো
কলকাতা, ১৯শে আগস্ট— প্রথমে পুলিসের লাঠির তাড়ায় ছাত্রীদের রাজপথে লুটোপুটি খেতে হলো তারপর ঘাড়ধাক্কা দিয়ে কয়েকশো ছাত্র-ছাত্রীকে গারদে পোরা হলো। ব্যারিকেডের লোহার রেলিং পায়ে পড়ে রক্তাক্ত হতে হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের। শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর চলেছে পুলিসের বেধড়ক লাঠিচার্জ। এত সবকিছুর পর রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ছাড়পত্র মিললো বামপন্থী ছাত্র নেতাদের। শুক্রবার এস এফ আই সহ চারটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বিধানসভায় রাজ্য সরকারের কাছে রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য, সন্ত্রাসের মোকাবিলার দাবি জানাতে গেলে এমনই নৃশংস, অমানবিক নজির তৈরি করলো মমতা ব্যানার্জির পুলিস। গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের অনেককেই রাত পর্যন্ত ছাড়া হয়নি ।
পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী, এদিন এস এফ আই, এ আই এস এফ, এ আই এস বি, পি এস ইউ এই চারটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বিধানসভা অভিযান কর্মসূচী নিয়েছিল। কলেজ স্ট্রিট থেকে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী মিছিল করে বিধানসভায় যায়। রানী রাসমনি রোডের উপর সেই মিছিলকে আটকে দেয় পুলিস। রাস্তার অদূরেই বিধানসভায় তখন উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। রাজ্যে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী অপেক্ষা করছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন দিতে। শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের এই অবস্থান চলছিল। এরপরই নজিরবিহীনভাবে ছাত্রদের সঙ্গে বাক্বিতণ্ডায় পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে পুলিস। ছাত্র-ছাত্রীরা পুলিসের এই আচরণে সংযত হয়েই পুলিসের ব্যারিকেডের কাছে চলে আসে। উলটোদিক থেকে পুলিস সেই ব্যারিকেডকে সজোরে ধাক্কা মারলে সামনে থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা আঘাত পায়। লাঠি উঁচিয়ে পুলিসের তাড়ায় ছাত্রীরা অনেকেই রাজপথে পড়ে যায়। ব্যারিকেডের লোহার রেলিং পায়ের উপর পড়ে রক্তাক্ত হয় কয়েকজন ছাত্র। সেসময় এস এফ আই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ঋতব্রত ব্যানার্জি, রাজ্য সভাপতি কৌস্তভ চ্যাটার্জি, সম্পাদক সায়নদীপ মিত্র পুলিসকে জানান, ‘আমাদের দাবি বলতে চাই রাজ্য সরকারকে। সরকার সময় দিলেই আমরা যাব। তারপরই ছাত্র-ছাত্রীরা এখান থেকে চলে যাবে।’ কিন্তু ছাত্র নেতৃত্বের এই কথায় আমল না দিয়ে পুলিস ঘটনাস্থল থেকে প্রায় হাজার বামপন্থী ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেপ্তার করে। প্রায় ১৫টা বাস বোঝাই করে চারটি বামপন্থী ছাত্র নেতৃত্বসহ ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেসিডেন্সি জেলে অথবা লালবাজারের গারদে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর আরও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটালো মমতা ব্যানার্জির পুলিস। ছাত্রনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি ও সায়নদীপ মিত্রকে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে পুলিস জানায়। কিন্তু মাঝপথে ভিক্টোরিয়ার সামনে ঐ দুইজন নেতৃত্ব ছাড়াও অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সদস্যদের বাস থেকে নামিয়ে দেয় পুলিস। পুলিসের পক্ষ থেকে তাঁদের বলা হয়, ‘আপনারা এবার বিধানসভায় গিয়ে দেখা করতে পারেন। ভিক্টোরিয়া থেকে তাঁরা হেটে বিধানসভায় পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানান। এদিকে একে একে রানী রাসমণি রোড থেকে এস এফ আই-এর সমস্ত নেতাকে গ্রেপ্তার করে গারদে পুরে দেওয়া হয়। তখনও কয়েকজন বামপন্থী ছাত্র রানী রাসমণি রোডের উপর শান্তিপূর্ণভাবে বসে অপেক্ষা করছিল পরিষদীয় মন্ত্রীর সঙ্গে কি কথা হয়েছে তা জানার জন্য। ঠিক এই সময়ই মমতা ব্যানার্জির পুলিস ঐ অবস্থানরত ছাত্র-ছাত্রদের উপর ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে। কিছু বোঝার আগেই ততক্ষণে পুলিসের লাঠির ঘায়ে জখম হন কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী। কারোর পায়ে আঘাত লাগে, কেউ বা পুলিসের লাঠি আঘাত বাঁচাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।
প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় রাজ্যে ‘শিক্ষার গণতন্ত্র’কে টুঁটি টিপে মেরে ফেলার চেষ্টাকে যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে আন্দোলন করছে এস এফ আই সহ চারটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। পুলিসের লাঠি বা জোর করে গারদে পুরে যে বামপন্থীদের দমিয়ে রাখা যাবে না, তা এদিন আবারও মনে করিয়ে দেওয়া হলো তৃণমূলের জোট সরকারকে। এদিন বিধানসভা অভিযানের আগে কলেজ স্ট্রিটে এক সংক্ষিপ্ত পথসভায় চার বামপন্থী ছাত্রনেতৃত্ব সেই বার্তাই দিলেন। একই সঙ্গে মাত্র আড়াই মাসের রাজত্বে শিক্ষাক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও গণতন্ত্রকে নিকেশ করা চলছে তার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন ছাত্র নেতৃত্ব। তাঁরা বলেন, ‘একটা বা দুটো নয়। দশটা অথবা কুড়িটাও নয়। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে রাজ্যের ৬৯টি কলেজে নির্বাচিত বামপন্থী ইউনিয়ন জোর করে, বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ছাত্র সংসদ দখল করেছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। এখানেই শেষ নয়। নৃশংস অত্যাচার, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের পরিবেশে বামপন্থী ছাত্রকর্মীদের পরীক্ষাও দিতে দেওয়া হয়নি। কলেজ ক্যাম্পাসগুলিতে সত্তরের কালো সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত।
রাজ্যে নতুন সরকারের তরফ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে যে একগুচ্ছ তুঘলকি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তার সমালোচনা করে ছাত্রনেতারা এদিন বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রকে নয়া উদারনীতির মুখে ঠেলে দেওয়ার নজির পেশ করেছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। সরাসরি স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফি বৃদ্ধির পক্ষে সওয়াল তুলেছেন তিনি। রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর অভিনব যুক্তি, ছাত্রছাত্রীরা যদি সিনেমা দেখতে যেতে পারে, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি-ও বাড়ানো যায়। এদিকে, জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভর্তির ক্ষেত্রেও মেধার প্রশ্ন শিকেয় তুলে আপস করা হচ্ছে দুর্নীতির সঙ্গে। মেধার বাইরে গিয়েই লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ছাত্র ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করে সিনেট, সিন্ডিকেটসহ গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত যাবতীয় পরিকাঠামোকে অচল করে রাখা হয়েছে। এদিন মিছিল শুরুর আগে কলেজ স্ট্রিটের সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখেন এস এফ আই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ঋতব্রত ব্যানার্জি, রাজ্য সভাপতি কৌস্তভ চ্যাটার্জি, সম্পাদক সায়নদীপ মিত্র, এ আই এস এফ-এর পক্ষে পার্থ মুখার্জি, এ আই এস বি’র পক্ষে বিশ্বজিৎ মাইতি, পি এস ইউ’র পক্ষে মৃন্ময় সেনগুপ্ত।

Recent comments
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 38 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago
1 year 39 weeks ago